২০২৪ বছরজুড়ে প্রযুক্তির আলোচিত সেরা ০৫ (পাচঁ)

বছরজুড়ে বিজ্ঞানচিন্তায় প্রকাশিত হয়েছে প্রযুক্তি জগতের নানা আলোচিত ঘটনা ও উদ্ভাবনের কাহিনি। শুধু তা-ই নয়, এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ ম্যাগাজিন, কোয়ান্টা ম্যাগাজিনসহ বেশ কিছু প্রকাশনা বছরজুড়ে আলোচিত প্রযুক্তির তালিকা প্রকাশ করেছে। এর মধ্য থেকে বাছাইকৃত, বিজ্ঞানচিন্তার চোখে বছরজুড়ে আলোচিত ৫ প্রযুক্তি দেখে নিন একনজরে।

1. সবকিছুর জন্য এআই

২০২২ সালের নভেম্বরে ওপেনএআই যখন চ্যাটজিপিটি বাজারে আনে, তখনো কেউ জানত না কী ঝড় আসতে যাচ্ছে প্রযুক্তি জগতে। পাল্লা দিতে গিয়ে মাইক্রোসফট বাজারে আনে বিং চ্যাট আর গুগল কিছুদিন পরে বার্ড নামে একটি এআই বাজারে আনে। দেখা গেল, এগুলো অত ভালো কাজ করছে না, ভুল করছে বারবার। কিন্তু আলাদিনের দৈত্য একবার চেরাগ থেকে বেরিয়ে গেলে সে কি আর বোতলে ফেরে? কাজে কাজেই, দুই বছর পর দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই লেগেছে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়া। কিছু লিখতে, কোড করতে বা প্রয়োজনীয় নানা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে চ্যাটজিপিটি। মাইক্রোসফটের কো-পাইলটের বদৌলতে সাধারণ ছবি বানানো, লেখা, কোড করাসহ যেকোনো জিজ্ঞাসার জবাব পাওয়া যাচ্ছে চট করে। ওদিকে গুগল সব কাজেই এআই ব্যবহার করছে, সার্চেও এসেছে এআই ল্যাব নামে একটি অপশন। ওদিকে ছবির জগতে আধিপত্য করছে মিডজার্নি, লেখা থেকে ভিডিও বানাতে ওপেনএআই নিয়ে এসেছে সোরা এআই।
সবকিছুর জন্য এআই—এ কথা যেমন সত্যি, তেমনি এটাও সত্যি যে এআই যেন নিজেই জীবনের বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ করতে শুরু করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাপোলো রিসার্চ এক গবেষণায় প্রমাণ পেয়েছে, চ্যাটজিপিটির নতুন মডেল ও১ (o1) আত্মরক্ষার্থে মিথ্যে বলার পাশাপাশি, নিজেকে বাঁচাতে প্রয়োজনীয় ‘লুকোচুরি’ এবং ‘প্রতারণা’ করতে পারে। আসলে, একটি কাজ করতে গিয়ে চ্যাটজিপিটির ও১ মডেল যখন টের পায়, কাজ ঠিকভাবে না করলে তাকে বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে (এবং নতুন মডেল আনা হতে পারে), তখন এটি নিজের কপি রাখতে শুরু করে ভিন্ন সার্ভারে, লুকিয়ে। ধরা পড়ার জিজ্ঞাসাবাদে এটি ‘টেকনিক্যাল এরর’-এর ওপর দায় চাপিয়ে দিয়ে অস্বীকার করতে চেয়েছে প্রায় ৯৯ শতাংশ সময়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণায় বড় অগ্রগতি মনে করা হচ্ছে এটিকে—এ যেন জীবনের লক্ষণ। পাশাপাশি শঙ্কা ও বিতর্কও উসকে দিয়েছে এ গবেষণা।

2. কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে গুগলের মাইলফলক
এ বছর গুগল কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে নতুন চমক নিয়ে হাজির হয়েছে। এ চমকের নাম ‘দ্য উইলো কোয়ান্টাম চিপ’। বাস্তব দুনিয়ার সমস্যা সমাধানে ‘বিলো থ্রেশহোল্ড’ নামে একটি মাইলফলক অর্জন করেছে এই চিপ। কোয়ান্টাম এরর কারেকশনে এই মাইলফলক অর্জনের লক্ষ্যে প্রায় ৩০ বছর ধরে কাজ করছেন প্রযুক্তিবিদেরা। অবশেষে সেই অপেক্ষা শেষ হলো।
এই অর্জনে আসলে কী করেছে গুগল? কোয়ান্টাম কম্পিউটারের একক কিউবিট। কিন্তু কোয়ান্টাম জগতের অদ্ভুতুড়ে নিয়ম-কানুনের কারণে যত বেশি কিউবিট একটি কম্পিউটারে ব্যবহার করা হতো, দেখা যেত, বাড়ছে ভুলের পরিমাণ। গুগল এ ক্ষেত্রে দেখিয়েছে, কিউবিট বাড়ানোর ফলে ভুলের পরিমাণ কমছে সূচকীয় হারে। শুধু তাই নয়। এ কোয়ান্টাম চিপ ৫ মিনিটের কম সময়ে যে পরিমাণ কম্পিউটেশনের কাজ করতে পারে, দুনিয়ার সবচেয়ে দ্রুতগামী সুপারকম্পিউটারের সে পরিমাণ কাজ করতে লাগবে ১০ সেপ্টিলিয়ন বছর। এর মানে ১০২৫ বছর—এককথায়, মহাবিশ্বের বয়সের চেয়েও বেশি।
এ গবেষণার হাত ধরে ব্যবহারযোগ্য কোয়ান্টাম কম্পিউটার বাস্তব হয়ে ওঠার পথে অনেকদূর অগ্রগতি হলো। পরবর্তী ধাপ: বাস্তব দুনিয়ায় যে সব অ্যালগরিদম বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজে লাগে, যেমন ড্রাগ আবিষ্কার, শক্তি সংরক্ষণ বা এআইয়ের অগ্রগতির জন্য অপ্টিমাইজ করা (প্রক্রিয়াটাকে ন্যূনতম পরিমাণ রিসোর্স ব্যবহার করে দ্রুততম উপায়ে করার পর্যায়ে নিয়ে আসা) ইত্যাদি কাজে ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠতে হবে উইলোকে। এখন সে লক্ষ্যেই কাজ করছেন গুগলের বিজ্ঞানীরা।

3. অ্যাসিস্টিভ টেকের জগতে বিপ্লব
২০২৪ সালে অ্যাসিস্টিভ টেক বা সহায়ক প্রযুক্তির জগতে বড় অগ্রগতি হয়েছে। এই অ্যাসিস্টিভ টেক আসলে কী? যেসব প্রযুক্তি বিশেষ করে প্রতিবন্ধী বা যেকোনো দৈহিক সমস্যা সম্পন্ন মানুষের কাজে সাহায্য করতে পারে, সে ধরনের প্রযুক্তি। ২০২৪ সালে বিশ্বের অন্যতম বড় প্রযুক্তি মেলা কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক শোতে (সিইএস ২০২৪) দেখা গেছে এমন বেশ কিছু প্রযুক্তি। যেমন হাত কাঁপে—এমন মানুষদের জন্য হাতমোজা বা গ্লাভ, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা রয়েছে, এমন মানুষের চারপাশ বুঝে চলতে সহায়ক বেল্ট, এমন চশমা যা সাইনবোর্ড, মেন্যু ইত্যাদি দেখে তথ্য পড়ে শোনাতে পারে ইত্যাদি।
ওদিকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ডানি ক্লডের সঙ্গে মিলে তৈরি করেছে প্রস্থেটিক বুড়ো আঙুল। হাতের খুঁটিনাটি কাজকর্মে মানুষকে সহায়তা করতে পারে এটি। হেপটিক ভেস্ট বা কম্পনশীল ভেস্ট বানিয়েছে নট ইম্পসিবল ল্যাবস—এটি বধিরদের কম্পন অনুভব করে মিউজিক উপভোগের সুযোগ করে দেবে।
সিইএসে আরও নানা ধরনের প্রযুক্তির ভীড়ে এই প্রযুক্তিগুলো অনেকেরই নজর কেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, ২০২৫ সালটি এসব প্রযুক্তির সহায়তায় প্রতিবন্ধীদের জন্য হবে আরও সহজ, আরও উপভোগ্য।

4. মানবমস্তিষ্কে চিপ বসাল ইলন মাস্কের নিউরালিংক
বছরের শেষে এসে শূন্যে থাকতেই চপস্টিকের মতো করে খপ করে যান্ত্রিক হাত লুফে নিয়েছে রকেট। এভাবে স্পেস-এক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক আবারও আলোচনায়। বছরের শুরুতেই যে তাঁর নিউরালিংক আরেক চমক নিয়ে হাজির হয়েছিল, সে কথা বোধ হয় ভুলে গেছেন অনেকে।
এ বছরের ২৯ জানুয়ারি এক্সে (আগের নাম টুইটার) ইলন মাস্ক জানান, ‘প্রথমবারের মতো এক ব্যক্তির মস্তিষ্কে সফলভাবে নিউরালিংকের চিপ যুক্ত করা হয়েছে। তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন। প্রাথমিকভাবে আশাজনক সাড়ার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে নিউরনে।’  
২০২৩ সালের মে মাসে এই চিপ বসানোর অনুমতি পায় নিউরালিংক। কীভাবে কাজ করবে এই চিপ? প্রথমে মানুষের মস্তিকে চুলের মতো সূক্ষ্ম তার ঢোকানো হবে খুব সাবধানে। তারপর সেই তারগুলো মস্তিষ্কের সংকেত সরাসরি ব্লুটুথ সংযোগের মাধ্যমে মোবাইলে পাঠানো যাবে। যাঁরা শারীরিকভাবে হাত নাড়াতে অক্ষম, তাঁরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম্পিউটার চালাতে পারবেন। সরাসরি হাত দিয়ে মাউস না চেপে মস্তিষ্কের সাহায্যে কম্পিউটারের কার্সর পরিচালনা করা যাবে। তাই ইলন মাস্ক এর নাম দিয়েছেন টেলিপ্যাথি। তবে এ ধরনের প্রযুক্তির সাধারণ নাম হলো ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস বা বিসিআই।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, যে ব্যক্তির মাথায় চিপ বসানো হয়েছে, তিনি সুস্থ ও ভালো আছেন, সব কাজকর্ম করতে পারছেন। মাস্ক জানিয়েছেন, ‘এখন শুধু চিন্তা করে করে একটি স্ক্রিনে মাউস (কার্সর) নাড়াতে পারছেন তিনি।’ এই প্রযুক্তি কতদূর এগিয়ে যাবে, তা দেখতে মুখিয়ে আছেন বিশেষজ্ঞরাও।

5. সিইএস ২০২৪-এ তাক লাগানো সব প্রযুক্তি
একটু ভালোভাবে দেখলেই বোঝা যায়, ২০২৪ সালে প্রযুক্তি জগতে মূলত বেশির ভাগ উন্নতি হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক। এর বাইরে যে বড় কাজগুলো হয়েছে, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক জগতে, সেগুলো যেন আলোচনায় আসতে পারেনি সেভাবে। অথচ সবাইকে চমকে দিয়েছিল সিইএস বা কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক শোতে আসা বেশ কিছু প্রযুক্তি। হলোগ্রাম যোগাযোগ, পকেট এআই সহযোগী থেকে শুরু করে ‘হুন্দাই সুপারনাল এস-এ২’ এয়ার ট্যাক্সির মতো প্রযুক্তি ঝড় তুলেছিল প্রযুক্তি দুনিয়ায়। এই প্রযুক্তিগুলো অবশ্য এখনো সেই অর্থে বাজারে আসেনি। তবে সিইএস ২০২৪ যে প্রযুক্তি জগতে এ বছরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা এবং সামনের দিনের প্রযুক্তির দিক ঠিক করে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকখানি ভূমিকা রাখবে, এটুকু নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।


 

ফলো করুন
শেয়ার করুন: